স্বাধীন ইন্টারনেট ব্যবহারে পিছিয়ে বাংলাদেশ


ফ্রিডম হাউসের প্রতিবেদন

স্বাধীন ইন্টারনেট ব্যবহারে পিছিয়ে বাংলাদেশ

নিজস্ব প্রতিবেদক | আপডেট: | প্রিন্ট সংস্করণ




ইন্টারনেট ব্যবহারের স্বাধীনতায় গত এক বছরে বাংলাদেশের অবস্থানের অবনতি হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক বেসরকারি সংস্থা ফ্রিডম হাউস প্রকাশিত ‘ফ্রিডম অব দ্য নেট ২০১৬’ শীর্ষক এক প্রতিবেদনে এ তথ্য তুলে ধরা হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমসহ বিভিন্ন ওয়েবসাইটে প্রবেশ সাময়িকভাবে বন্ধ করা, ইন্টারনেটে মতপ্রকাশের কারণে গ্রেপ্তার ও হামলার শিকার হওয়া ইত্যাদি কারণে সূচকে বাংলাদেশ পিছিয়ে গেছে।
চার বছর ধরেই ক্রমাগত পিছিয়েছে বাংলাদেশের অবস্থান। এ বছর সবচেয়ে বেশি পেছানো পাঁচটি দেশের একটি হলো বাংলাদেশ।
প্রতিবেদনে অন্তর্ভুক্ত ৬৫টি দেশকে শূন্য থেকে ১০০ নম্বর দেওয়া হয়েছে। প্রাপ্ত নম্বরের ভিত্তিতে প্রতিটি দেশের অবস্থানকে তিনটি শ্রেণিতে ভাগ করা হয়েছে। যেসব দেশ শূন্য থেকে ৩০ নম্বর পেয়েছে, সেসব দেশ ইন্টারনেট ব্যবহারে সম্পূর্ণ ‘স্বাধীন’ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। যেসব দেশের নম্বর ৩১ থেকে ৬০, সেগুলোকে ‘আংশিক স্বাধীন’ বলা হয়েছে। ৬১ থেকে ১০০ নম্বর পাওয়া দেশগুলোকে ইন্টারনেট ব্যবহারে ‘পরাধীন’ উল্লেখ করা হয়েছে। অর্থাৎ নম্বর বেশি পাওয়া নেতিবাচক প্রবণতার পরিচায়ক। ২০১৫ সালের জুন থেকে এ বছরের মে পর্যন্ত সময়ের তথ্যকে প্রতিবেদন তৈরিতে বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইন্টারনেট স্বাধীনতার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ১০০ নম্বরের মধ্যে পেয়েছে ৫৬ নম্বর। সে হিসাবে ইন্টারনেট ব্যবহারে বাংলাদেশের মানুষ আংশিক স্বাধীন।

নম্বর বণ্টনে তিনটি বিষয় বিবেচনা করা হয়েছে। এর মধ্যে ইন্টারনেটে প্রবেশে বাধার বিষয়ে ২৫ নম্বর, বিষয়বস্তু সীমিত করায় ৩৫ নম্বর ও ব্যবহারকারীর অধিকার লঙ্ঘনে ছিল ৪০ নম্বর। ইন্টারনেটে প্রবেশে বাধার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ২৫-এর মধ্যে ১৪ নম্বর, বিষয়বস্তু সীমিত করার ক্ষেত্রে ৩৫-এর মধ্যে ১৪ নম্বর এবং ব্যবহারকারীর অধিকার লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে ৪০-এর মধ্যে ২৮ নম্বর পেয়েছে।
ইন্টারনেট স্বাধীনতার ক্ষেত্রে ২০১৫ সালে বাংলাদেশের স্কোর ছিল ৫১। আর ২০১৪ ও ২০১৩ সালে ছিল ৪৯। অর্থাৎ গত চার বছরে ইন্টারনেট ব্যবহারে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ধারাবাহিকভাবে কমেছে।
প্রতিবেদন তৈরিতে বিশ্বের ৬৫টি দেশের ইন্টারনেট স্বাধীনতার অবস্থা পর্যালোচনা করা হয়েছে। এর মধ্যে বাংলাদেশসহ ৩৪টি দেশে গত বছরের তুলনায় ইন্টারনেট স্বাধীনতা কমেছে। সবচেয়ে বেশি কমেছে উগান্ডা, বাংলাদেশ, কম্বোডিয়া, ইকুয়েডর ও লিবিয়ায়। দক্ষিণ এশিয়ায় বাংলাদেশ ছাড়াও ভারত, পাকিস্তান ও শ্রীলঙ্কার ইন্টারনেট ব্যবহার পরিস্থিতি উঠে এসেছে। এ ছাড়া প্রতিবেদনে বিশ্বের প্রায় ৮৮ শতাংশ ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর অভিজ্ঞতা তুলে ধরা হয়েছে।
ফ্রিডম হাউসের প্রতিবেদনে টানা ছয় বছর ধরে বিশ্বজুড়ে ইন্টারনেট ব্যবহারে স্বাধীনতা কমে যাওয়ার বিষয়টি তুলে ধরা হয়েছে। এ বিষয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সারা বিশ্বের ৬৭ শতাংশ ইন্টারনেট ব্যবহারকারী এমন দেশে বাস করেন, যেখানে সরকার, সামরিক বাহিনী ও শাসক পরিবারের সমালোচনা করার বিষয়ে বিধিনিষেধ রয়েছে। ফেসবুকের মতো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্ট দেওয়ার কারণে গত এক বছরে ৩৮টি দেশের সরকার নাগরিকদের গ্রেপ্তার করেছে। বাংলাদেশের সাংবাদিক প্রবীর শিকদারের গ্রেপ্তারের ঘটনাটিকে এ ক্ষেত্রে উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে।
হোয়াটসঅ্যাপ, টুইটার, ভাইবারের মতো অ্যাপ্লিকেশনভিত্তিক যোগাযোগমাধ্যম বন্ধের প্রবণতাও সারা বিশ্বে গত এক বছরে বেড়েছে বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। গত বছরের প্রতিবেদনে সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যম ও যোগাযোগের অ্যাপ্লিকেশনে বাধা দেওয়া সরকারের সংখ্যা ছিল ১৫। এ বছর তা বেড়ে হয়েছে ২৪। গত বছরের নভেম্বরে ফেসবুক, ভাইবারসহ বিভিন্ন যোগাযোগমাধ্যম বাংলাদেশে বন্ধ করে দেওয়ার বিষয়টিও প্রতিবেদনে স্থান পেয়েছে।
ফ্রিডম হাউসের তথ্য অনুযায়ী, এ বছর সবচেয়ে বেশি দেশে বন্ধ হওয়া অ্যাপ্লিকেশন হচ্ছে হোয়াটসঅ্যাপ। অন্যান্য অ্যাপ ব্যবহারকারীর চেয়ে এ বছর ফেসবুক ব্যবহারকারীরা বিভিন্ন দেশে বিভিন্ন আইনে আটক হয়েছেন বেশি। এ বছর ২৭টি দেশে ফেসবুক ব্যবহারকারী আটক হয়েছেন।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইন্টারনেট ব্যবহারে সবচেয়ে স্বাধীন দেশ হলো এস্তোনিয়া ও আইসল্যান্ড। দেশ দুটি গতবারও শীর্ষ অবস্থানে ছিল। শীর্ষ পাঁচে থাকা বাকি তিনটি দেশ হলো যথাক্রমে কানাডা, যুক্তরাষ্ট্র, জার্মানি।জানতে চাইলে তথ্যপ্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ ও বেসিসের সাবেক সভাপতি ফাহিম মাশরুর প্রথম আলোকে বলেন, তথ্যপ্রযুক্তি আইনের বিশেষ একটি ধারার কারণে মানুষ এখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মতপ্রকাশে ভয় পায়। সেটির একটি প্রভাব এই প্রতিবেদনে পড়েছে। তা ছাড়া বিশ্বজুড়ে ইন্টারনেট গুটি কয়েক প্রভাবশালী প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণে চলে যাচ্ছে। সে কারণেও ইন্টারনেট ব্যবহারে মানুষের স্বাধীনতা কমছে।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন